Just Talk Creation

Header Ads Widget

Taking copyright Strike. Can we get monetization, another videos watch time and subscribers ?কপিরাইট







 

মেয়েটি এবং ছেলেটি


 মেয়েটি এবং ছেলেটি

-সুবোধ সরকার


মেয়েটা এবং ছেলেটা একদিন বাড়ি থেকে পালালো

তারা আপাতত একটি অরণ্যের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু সারা শহরে ছেলেটির বাবা খুঁজে বেড়াচ্ছে মেয়েটির বাবাকে

ছেলেটির মা খুঁজে বেড়াচ্ছে মেয়েটির মাকে

ছেলেটির দাদা খুঁজে বেড়াচ্ছে মেয়েটির দাদাকে

একটা কিছু হবে। কোনও একজনের লাশ পড়বে।

ওদিকে ছেলেটি আর মেয়েটি একটি গহন অরণ্যের ভেতর।

ছেলেটি মেয়েটিকে চুম্বন করছে

আপাতত মেয়েটির নাম আত্মহারা

ছেলেটির নাম উদভ্রান্ত।

কিন্তু সারা শহর ছেলেটির বাবা

খুঁজে বেড়াচ্ছে মেয়েটির বাবাকে

সত্যি সত্যি তাদের দেখা হয়ে গেল একদিন

দুই বাবার সংলাপ:

: আপনার মেয়েটি একটা জিনিস

: আপনার ছেলেটি একটা বাঁদর

: আপনার মেয়েটি একটা চিড়িয়া

: আপনার ছেলেটি একটা নকশাল

ওদিকে বিহার উড়িষ্যা ছাড়িয়ে ওরা তখন অন্ধ্রের দিকে

ছেলেটি মেয়েটির হাত ধরল

মেয়েটি ছেলেটির কোমর ধরল।

তরপর তিনদিন তিনটে বাংলা কাগজে স্টোরি

কীভাবে তারা পালিয়েছে, কোন কলেজে পড়ে

মেয়েটির চরিত্র কেমন, ছেলেটিকে লোকাল কমিটি ডেকেছিল কেন

কিন্তু ওরা তখন অন্ধ্রপ্রদেশের সূর্যাস্ত দেখেছে।

বাবা-মা, থানা-পুলিশ এবং সংবাদপত্র

আপনারা পারেন কিন্তু, অসীম আপনাদের ক্ষমতা

পৃথিবীর কোথাও যখন কোনও ভালোবাসা নেই

দিন না, ছেলেমেয়ে দুটোকে একটু ভালোবাসতে।


চরমপত্র


 চরমপত্র

এম,আর আখতার মুকুল

বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য, দুঃসাহসী অথচ সংযত ও সহিষ্ণু ৬৩ বছর বর্ষীয় ‘চির যুবা’ এম আর আখতার মুকুল-সসেই যে ছোটবেলায় বাঙালি ঘরাণার রেয়াজ মাফিক দু’দুবার বাড়ি থেকে পরায়ন-পূর্ব দিয়ে শুরু করেছিলেন জীবনের প্রথম পাঠ-তারপর থেকে আজ অবধি বহু দুস্তর ও বন্ধুর চড়া-উৎরাই, বহু উত্থান-পতন ও প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে যেতে হলেও আর কখনও তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি; রণে ভঙ্গ দিয়ে পিছ পা হননি কোনও পরিস্থিতিতেই। যা আছে কপালে, এখন একটা জেদ নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন অকুতোভয়ে। যার ফলে শেষ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই তার বিজয়ী মুকুটে যুক্ত হয়েছে একর পর এক রঙ্গিন পালক।

জীবিকার তাগিদে কখনও তাকে এজি অফিসে, সিভিল সাপ্লাই একাউন্টস, দুর্নীতি দমন বিভাগ, বীমা কোম্পানিতে চাকুরি করতে হয়েছে। কখনওআবার সেজেছেন অভিনেতা, হয়েছেন গৃহশিক্ষক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার, বিজ্ঞাপন সংস্থার ব্যবস্তাপনা পরিচালক, সুদূর লন্ডনে গর্মেন্টস ফ্যাক্টরিরর কাটার। প্রতিটি ভূমিকাতেই অনন্য সাফল্যের স্বাক্ষর। কখনও হাত দিয়েছেন ছাপাখান, আটা, চাল কেরোসিন, সিগারেট, পুরানো গাড়ি বাস-ট্রাকের ব্যবসায়। করেছেন ছাত্র রাজনীতি। ১৯৪৮-৪৯ সালে জেল খেটেছেন। জেল থেকেই স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। অংশগ্রহণ করেছেন ভাষা আন্দোলনে, হাসিমুখে বরণ করেছেন বিদেশের মাটিতে সাড়ে তিন বছরের নির্ভাসিত জীবন; যখনই যা-কিছু করেছেন, সেটাকেই স্বকীয় মহিমায় সমুজ্জ্বল করে তুলেছেন। সাংবাদিকতা পেশায় নিযোজিত ছিলেন প্রায় দুই যুগের মতো। কাজ করেছেন বেশ কিছু দেশী-বিদেশী পত্র-পত্রিকা ও বার্তা সংস্থায়- বিভিন্ন পদ ও মর্যাদায়। বেশিরভাগ সময় কেটেছে দুধর্ষ রিপোর্টার হিসেবে। সফরসঙ্গী হয়েছেন মেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, ইস্কান্দার মীর্জা, আইয়ুব খান, বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দিন ভুট্টোর মতো বড় নেতাদের। সাংবাদিক হিসেবে ঘুরেছেন দুই গোলাধ্র্বের অসংখ্য দেশ। দেখেছেন বিচিত্র মানুষ, প্রথ্যক্ষদর্শী হয়েছেন বহু রুদ্ধশ্বাস চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রবাহের, সাক্সী ছিলেন বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের। বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ জীবন। বঙ্গবন্ধুর উষ্ণ সান্নিধ্য ও ভালবাসা তার জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়


 এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়

কাজী নজরুল ইসলাম


এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী।

ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনি॥

রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল,

আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল।

ঝঞ্ঝার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল ল’য়ে অশনি॥

কেতকী-কদম-যূথিকা কুসুমে বর্ষায় গাঁথ মালিকা,

পথে অবিরল ছিটাইয়া জল খেল চঞ্চলা বালিকা।

তড়াগে পুকুরে থই থই করে শ্যামল শোভার নবনী॥

শাপলা শালুক সাজাইয়া সাজি শরতে শিশির নাহিয়া,

শিউলি-ছোপানো শাড়ি পরে ফের আগামনী-গীত গাহিয়া।

অঘ্রাণে মা গো আমন ধানের সুঘ্রাণে ভরে অবনি॥

শীতের শূন্য মাঠে তুমি ফের উদাসী বাউল সাথে মা,

ভাটিয়ালি গাও মাঝিদের সাথে গো, কীর্তন শোনো রাতে মা।

ফাল্গুনে রাঙা ফুলের আবিরে রাঙাও নিখিল ধরণী॥


কৃষ্ণকলি


 কৃষ্ণকলি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,

কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।

মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে

কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।

ঘোমটা মাথায় ছিলনা তার মোটে,

মুক্ত বেণী পিঠের ওপর লোটে।

কালো?তা সে যতই কালো হোক ,

দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।

ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে

ডাকতেছিল শ্যামর দুটি গাই,

শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে

কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।

আকাশ পানে হানি যুগল ভুরু

শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।

কালো?তা সে যতই কালো হোক ,

দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।

পূবে বাতাস এল হঠাত্ ধেয়ে,

ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।

আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,

মাঠের মাঝে আর ছিলনা কেউ।

আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে,

আমি জানি আর জানে সে মেয়ে।

কালো ? তা সে যতই কালো হোক,

দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

এমনি করে কাজল কালো মেঘ

জ্যৈষ্ঠমাসে আসে ঈসান কোণে।

এমনি করে কালো কোমল ছায়া

আষাঢ় মাসে নামে তমাল বনে।

এমনি করে শ্রবণ-রজনীতে

হঠাত্ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।

কালো?তা সে যতই কালো হোক ,

দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,

আর যা বলে বলুক অন্যলোকে।

দেখেছিরেম ময়নাপাড়ার মাঠে

কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।

মাথার পরে দেয়নি তুলে বাস,

লজ্জা পাবার পায়নি অবকাশ।

কালো?তা সে যতই কালো হোক ,

দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।



আমার কুঁড়েঘরে


 আমার কুঁড়েঘরে

- হুমায়ুন আজাদ---সংকলিত (হুমায়ুন আজাদ)


আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল

তুষার জ’মে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ প’ড়ে আছে

গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভ’রে

বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আর দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে

আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক


আমার গ্রহ জুড়ে বিশাল মরুভূমি

সবুজ পাতা নেই সোনালি লতা নেই শিশির কণা নেই

ঘাসের শিখা নেই জলের রেখা নেই

আমার মরুভূর গোপন কোনো কোণে একটু নীল হয়ে

বাতাসে কেঁপে কেঁপে একটি শীষ আজ উঠুক


আমার গাছে গাছে আজ একটি কুঁড়ি নেই

একটি পাতা নেই শুকনো ডালে ডালে বায়ুর ঘষা লেগে

আগুন জ্ব’লে ওঠে তীব্র লেলিহান

বাকল ছিঁড়েফেড়ে দুপুর ভেঙেচুরে আকাশ লাল ক’রে

আমার গাছে আজ একটা ছোট ফুল ফুটুক


আমার এ-আকাশ ছড়িয়ে আছে ওই

পাতটিনের মতো ধাতুর চোখ জ্বলে প্রখর জ্বালাময়

সে-তাপে গ’লে পড়ে আমার দশদিক

জল ও বায়ুহীন আমার আকাশের অদেখা দূর কোণে

বৃষ্টিসকাতর একটু মেঘ আজ জমুক


আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল

তুষার জ’মে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ প’ড়ে আছে

গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভ’রে

বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আজ দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে

আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক।


আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে


 আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে

- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর---বলাকা


আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে;

পাকে পাকে ফেরে ফেরে

আমার জীবন দিয়ে জড়ায়েছি এরে;

প্রভাত-সন্ধ্যার

আলো-অন্ধকার

মোর চেতনায় গেছে ভেসে;

অবশেষে

এক হয়ে গেছে আজ আমার জীবন

আর আমার ভুবন।

ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো

জীবনেরে তাই বাসি ভালো।


তবুও মরিতে হবে এও সত্য জানি।

মোর বাণী

একদিন এ-বাতাসে ফুটিবে না,

মোর আঁখি এ-আলোকে লুটিবে না,

মোর হিয়া ছুটিবে না

অরুণের উদ্দীপ্ত আহ্বানে;

মোর কানে কানে

রজনী কবে না তার রহস্যবারতা,

শেষ করে যেতে হবে শেষ দৃষ্টি, মোর শেষ কথা।


এমন একান্ত করে চাওয়া

এও সত্য যত

এমন একান্ত ছেড়ে যাওয়া

সেও সেই মতো।

এ দুয়ের মাঝে তবু কোনোখানে আছে কোনো মিল;

নহিলে নিখিল

এতবড়ো নিদারুণ প্রবঞ্চনা

হাসিমুখে এতকাল কিছুতে বহিতে পারিত না।

সব তার আলো

কীটে-কাটা পুষ্পসম এতদিনে হয়ে যেত কালো।



সুরুল, ২৯ পৌষ, ১৩২১-প্রাতঃকাল


অচলা বুড়ি


 অচলা বুড়ি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


অচলবুড়ি, মুখখানি তার হাসির রসে ভরা

স্নেহের  রসে পরিপক্ক অতিমধুর জরা।

ফুলো ফুলো দুই চোখে তার,দুই গালে আর ঠোঁটে

উছলে-পড়া হৃদয় যেন ঢেউ খেলিয়ে  ওঠা।

পরিপুষ্ট অঙ্গটি তার, হাতের গড়ন মোটা,

কপালে দুই ভুরুর মাঝে উল্কি-আঁকা ফোটা।

গাড়ি চাপা কুকুর একটা মরতেছিল পথে,

সেবা ক‘রে বাঁচিয়ে তারে তুলল কোনোমতে।

খোঁড়া  কুকুর সেই ছিল তার নিত্যসহচর;

আধপাগলি ঝি ছিল এক , বাড়ি বালেশ্বর।

দাদাঠাকুর বলত,‘বুড়ি, জমল কত টাকা,

সঙ্গে ওটা যাবে না তো,বাক্সে রইল ঢাকা,

ব্রাহ্মণে দান করতে না চাও নাহয় দাও-না ধার,

জানোই তো এই অসময়ে টাকার কি দরকার।

বুড়ি হেসে বলে,‘ঠাকুর,দরকার তো আছেই,

সেইজন্যে ধার না দিয়ে রাখি টাকা কাছেই।

সাঁত্রাপাড়ার কায়েত বাড়ির বিধবা এক মেয়ে,

এককালে সে সুখে ছিল বাপের আদর পেয়ে।

বাপ মরেছ,স্বামী গেছে, ভাইরা না দেয় ঠাঁই—

দিন চালাবে এমনতরো উপায় কিছু নাই।

শেষ কালে সে ক্ষুধার দায়ে,দৈন্যদশার লাজে

চলে গেল হাঁসপাতালে রোগীসেবার কাজে।

এর পিছনে বিুড়ি ছিল,আর ছিল লোক তার

কংসারি শীল বেনের ছেলে মুকুন্দ মোক্তার।

গ্রামের লোকে ছিছি করে, জাতে ঠেলল তাকে,

একলা কেবল অচল বুড়ি আদর করে ডাকে।

সে বলে , তুই বেশ করেছিস যা বলুক যেবা,

ভিক্ষা মাগার চেয়ে ভালো দুঃখি দেহের সেবা।

জমিদারের মায়ের শ্রদ্ধা, বেগার খাটার ডাক --

রাই ডোম্নির ছেলে বললে, কাজের যে নেই ফাঁক ,

পারবে না আজ যেতে ।শুনে কোতলপুরের রাজা

বললে, একে যে ক‘রে হোক দিতে হবে সাজা।

মিশনরির স্কুলে প‘ড়ে কম্পোজিটরের

কাজ শিখে সে শহরেতে আয় করেছে ঢের—

তাই হবে কি ছোটলোকের ঘাড় বাঁকানো চাল।

সাক্ষ্য দিল হরিণ মৈত্রি,দিল মাখনলাল--

ডাকলুঠের এক মোকাদ্দমায় মিথ্যেজরিয়ে ফেলে

গোষ্ঠকে তো চালোন দিল সাত বছরের জেলে ।

ছেলের নামের অপমানে আপন পাড়া ছাড়ি

ডোম্নি গেল ভিন গাঁয়েতে পাততে নতুন বাড়ি ।

প্রতি মাসে অচল বুড়ি দামোদরের পারে

মাসকাবাবের জিনিস নিয়ে দেখে আসত তারে।

যখন তাকে খোঁটা দিল  গ্রামের শম্ভু পিসে

‘রাই ডোম্নির ‘পরে তোমার এত দরদ কিসে ‘

বুড়ি বললে, যারা ওকে দিল দুঃখরাশি

তাদের পাপের বোঝা আমি হালকা করে আসি।

পাতানো এক নাতনি বুড়ির একজ্বরি জ্বরে

ভুগতেছিল স্বরুপগঞ্জে  আপন শ্বশুরঘরে।

মেয়েটাকে বাঁচিয়ে তুলল দিন রাত্রি জেগে,

ফিরে এসে আপনি পড়লো রোগের ধাক্কা লেগে

দিন ফুরলো,দেবতা শেষে ডেকে নিল তাকে,

এক আঘাতে মারল যেন সকল পল্লীটাকে।

অবাক হল দাদাঠাকুর অবাক স্বরুপকাকা,

ডোম্নিকে সব দিয়ে গেছে বুড়ির জমা টাকা।

জিনিসপত্র আর যা ছিল দিল পাগোল ঝিকে,

সঁপে দিল তারই হাতে খোঁড়া কুকুরটিকে ।

ঠাকুর বললে মাথা নেড়ে,অপত্রে এই দান।

পরলোকের হারালো পথ,ইহলোকের মান।


বাঙলা ভাষা


 বাঙলা ভাষা

- হুমায়ুন আজাদ---সংকলিত (হুমায়ুন আজাদ)


শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী, তুমি-আমি, দুর্বিনীত দাসদাসী-

একই শেকলে বাঁধা প’ড়ে আছি শতাব্দীর পর শতাব্দী।

আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরে স্তরে শেকলের ঝংকার।

তুমি আর আমি সে-গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়-

হাহাকার রূপান্তরিত হয় সঙ্গীতে-শোভায়।


লকলকে চাবুকের আক্রোশ আর অজগরের মতো অন্ধ শেকলের

মুখোমুখি আমরা তুলে ধরি আমাদের উদ্ধত দর্পিত সৌন্দর্য:

আদিম ঝরনার মতো অজস্র ধারায় ফিনকি দেয়া টকটকে লাল রক্ত,

চাবুকের থাবায় সুর্যের টুকরোর মতো ছেঁড়া মাংস

আর আকাশের দিকে হাতুড়ির মতো উদ্যত মুষ্টি।


শাঁইশাঁই চাবুকে আমার মিশ্র মাংসপেশি পাথরের চেয়ে শক্ত হয়ে ওঠে

তুমি হয়ে ওঠো তপ্ত কাঞ্চনের চেয়েও সুন্দর।

সভ্যতার সমস্ত শিল্পকলার চেয়ে রহস্যময় তোমার দু-চোখ

যেখানে তাকাও সেখানেই ফুটে ওঠে কুমুদকহ্লার

হরিণের দ্রুত ধাবমান গতির চেয়ে সুন্দর ওই ভ্রূযুগল

তোমার পিঠে চাবুকের দাগ চুনির জড়োয়ার চেয়েও দামি আর রঙিন

তোমার দুই স্তন ঘিরে ঘাতকের কামড়ের দাগ মুক্তোমালার চেয়েও ঝলোমলো

তোমার ‘অ, আ’ –চিৎকার সমস্ত আর্যশ্লোকের চেয়েও পবিত্র অজর


তোমার দীর্ঘশ্বাসের নাম চন্ডীদাস

শতাব্দী কাঁপানো উল্লাসের নাম মধুসূদন

তোমার থরোথরো প্রেমের নাম রবীন্দ্রনাথ

বিজন অশ্রুবিন্দুর নাম জীবনানন্দ

তোমার বিদ্রোহের নাম নজরুল ইসলাম


শাঁইশাঁই চাবুকের আক্রোশে যখন তুমি আর আমি

আকাশের দিকে ছুঁড়ি আমাদের উদ্ধত সুন্দর বাহু, রক্তাক্ত আঙুল,

তখনি সৃষ্টি হয় নাচের নতুন মুদ্রা;

ফিনকি দেয়া লাল রক্ত সমস্ত শরীরে মেখে যখন আমরা গড়িয়ে পড়ি

ধূসর মাটিতে এবং আবার দাঁড়াই পৃথিবীর সমস্ত চাবুকের মুখোমুখি,

তখনি জন্ম নেয় অভাবিত সৌন্দর্যমন্ডিত বিশুদ্ধ নাচ;

এবং যখন শেকলের পর শেকল চুরমার ক’রে ঝনঝন ক’রে বেজে উঠি

আমরা দুজন, তখনি প্রথম জন্মে গভীর-ব্যাপক-শিল্পসম্মত ঐকতান-

আমাদের আদিগন্ত আর্তনাদ বিশশতকের দ্বিতীয়ার্ধের

একমাত্র গান।


হঠাৎ নীরার জন্য-


 হঠাৎ নীরার জন্য-

 সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—

-

বাস স্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল

স্বপ্নে বহুক্ষণ

দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে–দিকচিহ্নহীন–

বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে

তোমাকে দেখছি কাল স্বপ্নে, নীরা, ওষধি স্বপ্নের

নীল দুঃসময়ে।


দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে, কার সঙ্গে? তুমি

আজই কি ফিরেছো?

স্বপ্নের সমুদ্র সে কী ভয়ংকর, ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন

তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙটির মতো দূরে

তোমার দিগন্ত, দুই উরু ডুবে কোনো জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো,

অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা।


এক বছর ঘুমোবো না, স্বপ্নে দেখে কপালের ঘাম

ভোরে মুছে নিতে বড় মূর্খের মতন মনে হয়

বরং বিস্মৃতি ভালো, পোশাকের মধ্যে ঢেকে রাখা

নগ্ন শরীরের মতো লজ্জাহীন, আমি

এক বছর ঘুমোবো না, এক বছর স্বপ্নহীন জেগে

বাহান্ন তীর্থের মতো তোমার ও-শরীর ভ্রমণে

পুণ্যবান হবো।


বাসের জানালার পাশে তোমার সহাস্য মুখ, ‘আজ যাই,

বাড়িতে আসবেন!’


রৌদ্রের চিৎকারে সব শব্দ ডুবে গেল।

‘একটু দাঁড়াও’, কিংবা ‘চলো লাইব্রেরির মাঠে’, বুকের ভিতরে

কেউ এই কথা বলেছিল, আমি মনে পড়া চোখে

সহসা হাতঘড়ি দেখে লাফিয়ে উঠেছি, রাস্তা, বাস, ট্রাম, রিকশা, লোকজন

ডিগবাজির মতো পার হয়ে, যেন ওরাং উটাং, চার হাত-পায়ে ছুটে

পৌঁছে গেছি আফিসের লিফ্‌টের দরজায়।


বাস স্টপে তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ।।